শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সিরিয়ায় স্বৈরশাসনের অবসান : এরপর কী?

আহমদ মতিউর রহমান
দুই বছর আগে শ্রীলংকায় যা ঘটেছিল সেই একই ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে à§« আগস্ট। শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের স্বৈরশাসকরা পালিয়েছিলেন জনরোষ থেকে বাঁচতে। একই ঘটনা ঘটলো এবার সিরিয়ায়। দেশটির ‘স্বৈরশাসক’ প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। জানা যাচ্ছে সিরিয়ায় বাশারের বিরুদ্ধে অভিযানের নেতৃত্ব দেয় হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামের একটি ইসলামিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। এর প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। এইচটিএস বলেছে, একটি অন্ধকার যুগের অবসান হলো এবং নতুন যুগের সূচনা ঘটেছে। সিরিয়ায় à§§à§© বছরের গৃহযুদ্ধের পর রোববার ক্ষমতাচ্যুত হন বাশার। মাত্র ১২ দিনের ‘ঝোড়ো’ অভিযানে দামেস্ক দখল করে নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, সত্যিকার অর্থেই মনে হচ্ছে যে এটা সিরিয়ায় ৫৪ বছরের স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত মুহূর্ত। আর সেখানে আসাদ পরিবারের রাজত্ব শেষ হলো। সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসন শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরু থেকে। ৫৪ বছর পর সেই পরিবারের শাসনমুক্ত হলো দেশটি। প্রশ্ন হচ্ছে এরপর কী? তবে এ প্রশ্নের উত্তর পেতে কিছু সময় লাগতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়েছেন। ক্রেমলিনের বরাতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানায়, বাশার দেশত্যাগের পর মস্কো গেছেন। সেখানে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি কৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশ সিরিয়া। জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় যুদ্ধের আগের এই দুই কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়া ৬৮ লাখ মানুষের মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি লোক সীমিত সুবিধা নিয়ে ভিড়ে উপচেপড়া শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। এর বাইরে আরও প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দেশটি ছেড়ে পালিয়েছে, যার বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়েছে লেবানন, জর্ডান এবং তুরস্কে। এসব দেশে সবমিলিয়ে ৫৩ লাখ সিরিয়ান শরণার্থী রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ সিরিয়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে। একইসঙ্গে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু, অবকাঠামোকে ধ্বংস এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলেছে।
মূলত বাশার আল আসাদের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাশিয়া ও ইরান অন্য ঘটনায় দুর্বল ও মনোযোগ হারানোর কারণেই তার এ পরিণতি হলো বলে মনে করছেন অনেকে। দ্যা সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো নাতাশা হল এমনটাই মনে করেন। তার মতে রাশিয়া কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত আর ইরান সমর্থিত দুই গোষ্ঠী হামাস ও হিজবুল্লাহ ইসরাইলের হামলায় বিপর্যস্ত। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৮ সাল থেকে দেশটি কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত, যেখানে বাশার আল-আসাদের কর্তৃত্ববাদী শাসন, কুর্দি বাহিনী এবং ইসলামি বিদ্রোহীরা বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত সিরিয়ায় যুদ্ধ শেষ করা কঠিন বলে বিশ্বাস করেছেন বিশ্লেষকেরা। তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা হুগো ব্যাচেগা বলেছেন, বাশার বিদায় নেওয়ায় বহু মানুষ খুশি কিন্তু এরপরই একটি প্রশ্ন নিশ্চিতভাবে আসবে যে এরপর কী হবে।
সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মোহাম্মদ আল-বশির। ২০২৫ সালের à§§ মার্চ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে থাকবেন। অন্যদিকে, ইসরাইলী বিমান সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এসব ডেভেলপমেন্ট যেমন ঘটছে তেমনি শংকার বিষয়টিও রয়েছে। কেননা সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেক বিশেষজ্ঞের। মঙ্গলবার টেলিভিশনের খবরে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল-আসাদ পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো। পেশায় প্রকৌশলী বশির সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্টের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বাশার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল জালালি ও বশিরের সঙ্গে বৈঠক হয়। জালালি জানিয়েছিলেন, তিনি সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি আছেন। শেষে তাই ঘটলো। অন্যদিকে বিবিসি জানাচ্ছে, ইসরাইলী বিমান সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) জানায়, সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক টার্গেটে ইসরাইলের বিমানগুলোর অন্তত একশ’ হামলার খবর দিয়েছে। যেসব জায়গায় হামলা হয়েছে তার মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন সংক্রান্ত একটি গবেষণা কেন্দ্র আছে বলেও খবর দিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। ইসরাইল বলছে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পর অস্ত্র যাতে ‘উগ্রপন্থীদের হাতে চলে না যায়’ সেজন্য তারা পদক্ষেপ নিয়েছে।
হায়াত তাহরির আল-শাম কারা? ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার সময় এ গোষ্ঠীটির নাম ছিলো জাবাত আল নুসরা, যা ছিলো সরাসরি আল-কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত। এর গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কথিত আইএস গ্রুপের নেতা আবু বকর আল বাগদাদী। এই গোষ্ঠীটিই প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ও প্রাণঘাতী ছিলো বলে অনেকে মনে করেন।
ফ্রি সিরিয়া নামে বিদ্রোহীদের যে জোট হয়েছিলো সেখানে তাদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছিলো। ২০১৬ সালে এই গোষ্ঠীর নেতা আবু মোহাম্মদ আল জোলানি আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন এবং জাবাত আল নুসরাকে বিলুপ্ত করে নতুন সংগঠন তৈরি করেন। এর নামই রাখা হয় হায়াত তাহরির আল -শাম এবং পরে এর সাথে আরও কিছু ছোট গোষ্ঠী যোগ হয়। আল-জোলানি প্রায় এক দশক ধরে নিজেকে অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছেন এবং তাদের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সিরিয়ায় একটি “ইসলামিক প্রজাতন্ত্র” গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি এবং তার গোষ্ঠী নিজেদের সিরিয়ার স্বাধীন অঞ্চলের বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। এইচটিএস ২০১৭ সালে সিরীয় স্যালভেশন গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা করে, যা ইদলিব প্রদেশে প্রশাসন পরিচালনা করে। আল-জোলানি ১৯৮২ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রিয়াদে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৮৯ সালে তার পরিবার সিরিয়ায় ফিরে আসে এবং দামেস্কের কাছাকাছি বসবাস শুরু করে। ২০০৩ সালে তিনি ইরাক চলে যান এবং আল-কায়েদা (ইরাক) সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। তিনি সেখানে বন্দী হন। ছাড়া পেয়ে সিরিয়ায় ফেরেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক স্যামুয়েল রামানি আল-জাজিরাকে বলেন, বাশারের পতনে এইচটিএসের সঙ্গে যে কয়েকটি গোষ্ঠী ছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ)। ভিন্নমত থাকা এই গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে এইচটিএস কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, এইচটিএস ও এসএনএর মধ্যে ২০২২ সালের আগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক লাহিব হিগাল। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, এটা পরিষ্কার নয় যে নতুন সরকার গঠনের পর তারা সিরিয়ার অন্য গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কীভাবে ভারসাম্য আনবে এবং কীভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা দেবে? কারণ, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সিরিয়ায় ইরাকের মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে এমন শঙ্কাও রয়েছে লাহিব হিগালের। এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি পথরেখা দিয়েছে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করা বাশারবিরোধী জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশন। জোটের প্রধান হাদি আল বাহরা রয়টার্সকে বলেছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সময় প্রয়োজন। এ ছাড়া ছয় মাসের মধ্যে একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করতে হবে। সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে চীন, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশও।
বাশারের বিদায়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাবে কি? এমন একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বহু বছরের শাসন শেষে বাশার আল-আসাদের পতন হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এটি ছিলো অচিন্তনীয়। আর এটাই সিরিয়ার জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ২০০০ সালে পিতা হাফিজ আল আসাদের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসেছিলেন বাশার আল-আসাদ এবং তারা বাবার মতোই শক্তভাবে দেশ শাসন করেছেন। বাশারের পিতা ঊনত্রিশ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম দিকে একটি প্রত্যাশা ছিলো যে তিনি হয়তো ভিন্ন হবেন- আরও খোলামেলা, তুলনামূলক কম নিষ্ঠুর। কিন্তু সেগুলো বেশি দিন টিকেনি। ২০১১ সালে তার সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন নৃশংসভাবে দমনের জন্য তিনি নিন্দিত হয়ে আছেন। ওই ঘটনাই সিরিয়াকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। এই যুদ্ধে পাঁচ লাখেরও অধিক মানুষ মারা যায় এবং শরণার্থীতে পরিণত হয় অন্তত ৬০ লাখ মানুষ। রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতা নিয়ে তিনি বিদ্রোহীদের দমন করে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এর কিছুই এবার ঘটেনি। তার সহযোগীরা নিজেদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত।
আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের শাসনের অবসান আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিতে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সিরিয়ায় এই পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বড় ধরনের ধাক্কা খেলো। আসাদের অধীনে সিরিয়া ছিলো ইরানিদের সাথে হিজবুল্লাহর যোগাযোগের অংশ। হেজবুল্লাহকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর জন্য এটা ছিলো মূল পথ। হিজবুল্লাহ নিজেই ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে মারাত্মক দুর্বল হয়ে গেছে এবং এর ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইরান সমর্থিত আরেকটি গোষ্ঠী হলো ইয়েমেনের হুথিরা। তারা বারবার বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশটিতে নাটকীয় এই পরিবর্তন ক্ষমতার বিপজ্জনক শূন্যতার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং এর ফলে আরও নৈরাজ্য, এমনকি আরও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ